শরীফুল হক : আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের দেয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে৩২ এমপি প্রার্থীর স্ত্রীরা নামকা ওয়াস্তে ব্যবসার উল্লেখ করলেও স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি মর্মে খবর পাওয়া গেছে।
পর্যবেক্ষনে দেখা যায়, চট্টগ্রামে সর্বনিম্ন ৪ কোটি থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৮ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ রয়েছে ৯ স্ত্রীর। তন্মধ্যে ৬ জনের সর্বোচ্চ তিন কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। সম্পদ নেই এমন ৫ জনকে বাদ দিলে বাকি প্রার্থীর স্ত্রীদের সর্বনিম্ন ২০ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্পদ রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো আয়ের ঘরে কোনো তথ্য না দিলেও অধিকাংশ এমপি প্রার্থী তাদের স্ত্রীর পেশা ব্যবসা কিংবা চাকরি দেখিয়েছেন। তবে অনেকেই দেননি। কেউ রেখেছেন ‘শূন্য’, কেউ লিখেছেন ‘প্রযোজ্য নহে’।
এবার আসা যাক চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারা আসনের প্রসঙ্গে। এ আসনে বহুল আলোচিত সমালোচিত বিএনপিদলীয় প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম। প্রশ্নের উদ্রেক করে তাঁর স্ত্রী নাজনীন নিজামকে দেখিয়েছেন পেশায় ব্যবসায়ী। আবার স্ত্রীর আয়ের ঘরে তিনি লিখেছেন ‘প্রযোজ্য নহে’। শুধু প্রকাশ্যে আসা তাঁর স্ত্রীর কোটি ২৪ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আনোয়ারা উপজেলার একাধিক সূত্র জানিয়েছে তার বেনামে সম্পদের পরিমান অনেক বেশি।
সরওয়ার জামাল নিজামের দেয়া উদ্ভট তথ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক বিষয়ে একাধিক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর থেকে প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া সম্পদের তথ্য ছিল মিথ্যায় ভরা।হলফনামায় মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমুলক ভূয়া তথ্য দেয়াটা চলে আসছে প্রতিটি নির্বাচনে।পতিত আওয়ামীলীগ হলফনামায় মিথ্যা ভ্রান্তিকর তথ্য দেয়াকে একজন আরেকজনের সাথে রীতিমতো প্রতিযোগীতা করে গেছে। আজ পর্যন্ত হলফনামায় উদ্দেশ্যমূলক ভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান ও সত্য গোপন করার জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হয়নি বলেও সূত্রটি উল্লেখ করেছে।
জামায়াত প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক চট্টগ্রাম-৯ কোতোয়ালি-বাকলিয়া আসনের প্রার্থী।তাকে সকল জামাত প্রার্থীর মাঝে সবচেয়ে অর্থশালী হিসেবে রেকর্ড করেছেন তেমনি তার স্ত্রী আমেনা শাহীনও অন্যান্য জামাত প্রার্থীদের স্ত্রীদের তুলনায় রেকর্ডের অধিকারী।তার সাড়ে ৪ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। অথচ হলফনামায় স্ত্রীর আয়ের ঘরে লিখেছেন ‘প্রযোজ্য নয়’।
বিএনপি’র আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রাম-১১ বন্দর-পতেঙ্গা আসনে প্রাথী। তাঁর স্ত্রী তাহেরা আলম। নির্ভরশীলদের আয়ের ঘরে ৩৭ লাখ টাকার হিসাব থাকলেও স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ সাত কোটি ৪০ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ড আসনে বিএনপিদলীয় এমপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর স্ত্রী। পেশা ব্যবসা হলেও বছরে সেখান থেকে তাঁর আয় হয় মাত্র ৯ লাখ ১৮ হাজার টাকা। অথচ জামিলা নাজনীন ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পদের মালিক। এর মধ্যে অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য ১২ কোটি টাকা ও স্থাবর সম্পত্তির মূল্য ছয় কোটি ১১ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম-৬ রাউজান আসনের বিএপিদলীয় প্রার্থী গোলাম আকবর খোন্দকারের স্ত্রী রিজিয়া আকবর খোন্দকার গোটা চট্টগ্রামে প্রার্থীর স্ত্রীদের মাঝে সম্পদের দিক থেকে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছেন।৪০ লাখ টাকার অস্থাবর ও ১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। তাতে কি হলফনামায় স্ত্রীর পেশা ব্যবসা দেখিয়ে স্ত্রীর আয়ের ঘরে দেননি কোনো তথ্য। লিখেছেন ‘প্রযোজ্য নহে’।
জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারী আসনের প্রার্থী। তিনি স্ত্রী স্ত্রী পারভীন মাহমুদের পেশা ব্যবসা চিহ্নিত করলেও সেখান থেকে কোনো আয় নেই বলে জানিয়োছেন। যদিও তাঁর স্ত্রীর ১৫ কোটি টাকার সম্পদ বিদ্যমান। এর মধ্যে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ১২ কোটি ১২ লাখ টাকার, আর স্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা।
এবার আসা যাক হুম্মাম কাদের চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামানজার শ্যামা খান প্রসঙ্গে। পেশা ব্যবসা হলেও তা থেকে আসে না কোনো আয়। তবুও ৪৩ কোটি ২০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে তাঁর। হুম্মাম কাদেরের সম্পদের পরিমাণ ৮১ লাখ ৯০ হাজার টাকা হলেও তাঁর তুলনায় স্ত্রীর সম্পদ ৫২ গুণ। নগদ টাকাও ৭ গুণ।
চট্টগ্রাম-৮ বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনের বিএনপিদলীয় প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর স্ত্রী সাদিয়া এরশাদ প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের সম্পদের মালিক। পেশা ব্যবসা দেখালেও স্ত্রীর আয়ের ঘরে শূন্য লিখেছেন স্বামী এরশাদ উল্লাহ।
চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ আসনে এলডিপি মনোনীত প্রার্থী ওমর ফারুকের স্ত্রী সাবিনা শারমিন। শিক্ষকতা পেশায় থাকলেও তাঁর কোনো আয় নেই। এটা কী করে সম্ভব তা জানা নেই কারো। অথচ পাঁচ কোটি ৭০ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তাঁর।
চট্টগ্রাম-১৫ সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমীনের স্ত্রীর নাম আনোয়ারা বেগম। পেশায় তিনি গৃহিণী। তারপরও চার কোটি ২০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে তাঁর।
চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশ আসনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী জসিম উদ্দিন আহমদের স্ত্রী তানজিনা সুলতানা জুহির কোনো আয় না থাকলেও তিন কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
চট্টগ্রাম-১২ পটিয়া আসনের জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদুল আলমের স্ত্রী সুলতানা বাদশার কোনো আয় না থাকলেও দুই কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। একই মূল্যের সম্পদ রয়েছে শেলী আকতারের। তিনি চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ আবু নাছেরের স্ত্রী।
চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়া আসনে জামায়াত প্রার্থী এটিএম রেজাউল করিমের স্ত্রী কোহিনুর নাহার চৌধুরী পেশায় চিকিৎসক। তাঁর সম্পদের পরিমাণ আড়াই কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম-৯ কোতোয়ালি আসনে বিএনপিদলীয় প্রার্থী আবু সুফিয়ানের নুরতাজ বেগম ও শর্মিলী ইয়াসমিন নামে দুইজন স্ত্রী রয়েছেন। তাদের দুজনই কোটিপতি।
চট্টগ্রাম-১০ হালিশহর-পাহাড়তলী আসনের বিএনপিদলীয় এমপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমানেরও দুই স্ত্রী। সাজিয়া আবদুল্লাহ ও ফজিলাতুন্নেছা সূচির পেশা ব্যবসা। তারা দুজনই কোটিপতি। এর মধ্যে সাজিয়া আবদুল্লাহ দুই কোটি ২০ লাখ ও ফজিলাতুন্নেছার এক কোটি ১৫ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে।
চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপ আসনে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা ও আলাউদ্দীন সিকদার। দুই প্রার্থীর গৃহিণী স্ত্রীর কোনো সম্পদ ও আয় নেই। ১৬টি আসনের মধ্যে কেবল সন্দ্বীপেই কোনো প্রার্থীর স্ত্রীরই সম্পদ নেই। একইভাবে জামায়াত প্রার্থী মাহমুদুল হাসানের স্ত্রী জোবায়দা আকতার, শাহজাহান মঞ্জুর স্ত্রী লুৎফর জাহান ও শামসুজ্জামান হেলালীর স্ত্রী ফাহমিনা কাদেরীর নামে কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নেই। অন্য প্রার্থীর স্ত্রীদের ২০ লাখ টাকা থেকে শুরু করে অন্তত ৬০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে।
শত ছাত্র-জনতার তাজা রক্তে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে অর্জিত জুলাই আন্দোলনের বিজয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য লাভ বাংলাদেশ তথা মাতৃভূমির প্রতি আনুগত্যে অবিচল থেকে সংস্কারের মাধ্যমে একটি জবাবদিহিতামূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণের। সেখানে এখনো পতিতসরকারের রেখে যাওয়া রেওয়াজমাফিক আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতি।প্রশ্ন উঠেছে ‘আয়ের ঘর শূন্য থাকলে কীভাবে এমপি প্রার্থীর স্ত্রীরা এত টাকার মালিক হন? বেশির ভাগ এমপি তাঁর স্ত্রীর পেশার ঘরে ব্যবসা লিখেছেন। যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট অবাস্তব।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও ওয়াকিবহাল মহলের মতে, উপরোক্ত চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের প্রার্থীর মতো দেশের বাকি অঞ্চলে একই চিত্র পরিদৃষ্ট হচেছ। অনলেইনে টেন্ডার জমাসহ রাষ্ট্রীয় বহুবিধ কার্যাবলী পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে জাতীয় নির্বাচন তথা স্থানীয় পর্যায়ের সকল নির্বাচনের কার্যক্রম কেন অনলাইনে হবেনা। পতিত সরকারের রেখে যাওয়া ফ্যাসিস্ট প্রেতাত্মা এবংসার্বিক দূর্নীতি নিমূলে হলফনামায় ঘোষিত তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা সমায়ের দাবী।