অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ: রাজপথে স্লোগান অনেকেই দেন।কেউ দেন দায়িত্ববোধ থেকে, কেউ দেন দলীয় আনুগত্যের কারণে। আবার কেউ কেউ দেন ভবিষ্যতের কোনো প্রাপ্তির আশায় – একটি পদ, একটি পরিচয় কিংবা সামান্য স্বীকৃতির প্রত্যাশায়।
কিন্তু ইতিহাসে খুব বেশি মানুষ নেই, যারা স্লোগান দেন নিছক ভালোবাসা থেকে – নিঃস্বার্থ বিশ্বাস থেকে।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির নেতা মাহমুদুর রহমান ছিলেন তেমনই এক মানুষ – রাজনীতির মঞ্চের আলো থেকে দূরে থাকা, অথচ রাজপথের ধুলো-মাটির সঙ্গে মিশে থাকা এক নিরহংকার সৈনিক।
২০২৩ সালের ২৮ জুলাই। ঢাকার নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশকে ঘিরে সারা দেশে তখন উত্তেজনা, আলোড়ন আর রাজনৈতিক আবেগের ঢেউ। নারায়ণগঞ্জ থেকেও শত শত নেতাকর্মী ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। তাদের সেই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন ৬২ বছর বয়সী এক মানুষ – মাহমুদুর রহমান। বয়স তার শরীরকে হয়তো একটু ধীর করেছে, কিন্তু মনকে নয়। তার চোখে তখনও ছিল তরুণদের মতো দীপ্তি, কণ্ঠে ছিল অবিচল দৃঢ়তা। দলের পতাকা উঁচিয়ে তিনি হাঁটছিলেন সামনে সামনে। তার কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল প্রিয় দলের স্লোগান। যারা তার পাশে হাঁটছিলেন, তারা পরে বলেছিলেন – সেদিন মাহমুদ ভাইয়ের কণ্ঠে যেন অন্যরকম আবেগ ছিল।
মনে হচ্ছিল তিনি শুধু স্লোগান দিচ্ছেন না – নিজের জীবনের সমস্ত ভালোবাসা, বিশ্বাস আর সংগ্রামের ইতিহাস ঢেলে দিচ্ছেন সেই ধ্বনিতে। ফকিরাপুল এলাকায় পৌঁছানোর পরও তিনি থামেননি। স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
হঠাৎ করেই – এক মুহূর্তে সবকিছু বদলে গেল।
কণ্ঠের সেই বজ্রধ্বনি আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেল।
তার শরীর হালকা কেঁপে উঠল। তারপর তিনি মাটিতে ঢলে পড়লেন। প্রথমে কেউ বুঝতেই পারেনি কী ঘটেছে! মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক আর হাহাকার। সঙ্গীয় বন্ধুরা ছুটে গিয়ে তাকে ধরে ফেললেন। তাড়াহুড়ো করে তাকে তুলে নেওয়া হলো এবং দ্রুত নিয়ে যাওয়া হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষা করছিল নির্মম এক সত্য। চিকিৎসকেরা কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে নীরব কণ্ঠে জানালেন – মাহমুদুর রহমান আর নেই! রাজপথেই থেমে গেছে তার জীবন।
সংবাদটি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যেন নেমে এলো এক নিঃশব্দ শোকের ছায়া। কারণ সবাই জানতেন –
মাহমুদুর রহমান কোনো পদ বা সুবিধার জন্য রাজনীতি করেননি। তিন দশক ধরে তিনি ছিলেন রাজপথের এক নীরব সৈনিক।
দল যখন ক্ষমতায় ছিল না – তখনও তিনি ছিলেন। যখন অনেকেই দূরে সরে গিয়েছিলেন – তখনও তিনি স্লোগান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজপথে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের ডনচেম্বার এলাকার একটি ছোট্ট ভাড়া বাসায় ছিল তার সংসার। সাদামাটা জীবন। তিন ছেলে, ছয় ভাই, তিন বোন আর অগণিত আত্মীয়স্বজন – এই ছিল তার পৃথিবী।
কিন্তু তার আরেকটি পরিবার ছিল – রাজপথের পরিবার। দলের কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন এক আন্তরিক বড় ভাই। যার কাছে রাজনীতি মানে ছিল বিশ্বাস, ভালোবাসা আর ত্যাগ।
তার মৃত্যুর খবর যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, অনেক নেতাকর্মীর চোখে জল নেমে আসে।
কারণ তারা জানতেন – এই মানুষটি কোনোদিন কিছু চাননি। শুধু ভালোবেসেছেন দলকে।
বলা হয়, যখন বিএনপির তদানীন্তন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রবাসে এই খবর শুনেছিলেন – যে একজন মানুষ নারায়ণগঞ্জ থেকে মিছিলের অগ্রভাগে হাঁটতে হাঁটতে, স্লোগান দিতে দিতে রাজপথেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন। কারণ রাজনীতির প্রকৃত শক্তি আসলে এমন মানুষদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে – যারা কোনো প্রাপ্তির জন্য নয়, শুধু বিশ্বাস আর ভালোবাসা থেকে লড়াই করে যান।
কিন্তু সময় বড় নির্মম। যে মাহমুদ দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে রাজপথে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন – আজ যেন সেই মাহমুদকে অনেকেই ভুলে গেছেন। তার পরিবারের খোঁজ নেওয়ার মানুষও খুব বেশি নেই। এই যদি হয় এক ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদের পরিণতি – তবে ভবিষ্যতে ভালো মানুষগুলো কি আর রাজনীতির পথে হাঁটতে সাহস পাবে?
মাহমুদের স্ত্রী এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না – যে মানুষটি সেদিন সকালবেলা স্লোগান দিতে দিতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন, তিনি আর কখনো বাসায় ফিরবেন না! কখনো কখনো এমনও মনে হয় – যদি এমনটি হতো…
একদিন হঠাৎ, কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই, নিঃশব্দে দলের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৌঁছে যেতেন নারায়ণগঞ্জ শহরের সেই ছোট্ট ভাড়া বাসায়। যেখানে এখনো শোকের ভারে নীরব হয়ে আছে একটি পরিবার। ঘরের এক কোণে বসে আছে তার তিন ছেলে। বাবার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে তারা নীরবে কাঁদছে।
সেই নীরব, শোকাচ্ছন্ন ঘরে যদি দলের চেয়ারম্যান গভীর আবেগে বলতেন – “মাহমুদুর রহমান শুধু আপনাদের পরিবারের সদস্য ছিলেন না, তিনি আমাদের সবার সবার পরিবারের সদস্য ছিলেন। তিনি রাজপথে যে ভালোবাসার ইতিহাস রেখে গেছেন – তা কোনোদিন মুছে যাবে না।”
মাহমুদুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের একটাই স্বপ্ন – একদিন হয়তো এমন একটি মুহূর্ত সত্যি হবে।
কারণ একটি দলের প্রকৃত শক্তি শুধু তার নেতা নন – বরং সেই অগণিত কর্মী, যারা নিঃস্বার্থ ভালোবাসা নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকেন।
নিজের জীবনকে বাজি রেখে।
মাহমুদুর রহমান আজ এই পৃথিবীতে নেই।
কিন্তু তার শেষ স্লোগান আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। সেটি শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয় – সেটি এক মানুষের শেষ ভালোবাসার ঘোষণা।
ইতিহাস হয়তো একদিন লিখবে – একজন সাধারণ কর্মী রাজপথে স্লোগান দিতে দিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। তার কণ্ঠের শেষ ধ্বনি মিলিয়ে গিয়েছিল ঢাকার রাজপথে। কিন্তু তার সেই আত্মত্যাগের গল্প একদিন ছুঁয়ে গিয়েছিল পুরো জাতির হৃদয়।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি ও ওয়ার্ল্ড পীছ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান।